ত্রিপুরা রাজ্যে ‘বিকশিত কৃষি সংকল্প অভিযান’ এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে, যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন সাফল্য এনেছে। এই অভিযানে মোট ১,৯৫,২৬৩ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন, যার মধ্যে ৬৬,৮৯৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ শতাংশই ছিলেন নারী কৃষক। এই সংখ্যা প্রাথমিক লক্ষ্য ১.৭২ লক্ষের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আজ এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের কৃষি ও কৃষক কল্যাণমন্ত্রী রতন লাল নাথ জানান, উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে আসামের পরই ত্রিপুরা এই অভিযানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সংখ্যক কৃষকের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এটি রাজ্যের কৃষি খাতের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন সাফল্য।
মন্ত্রী নাথ বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপ্ন হল কৃষিকে আধুনিক, সৃজনশীল ও স্থিতিশীল ব্যবস্থার অধীনে এনে ভারতকে বিশ্বের শস্য ব্যাংকে পরিণত করা। কৃষির উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য কেন্দ্র সরকার ‘এক দেশ, এক কৃষি, এক ধারণা’ নীতিতে কাজ করছে।”
তিনি আরও জানান, ২৯ মে থেকে ১২ জুন পর্যন্ত চলা এই অভিযানে দেশজুড়ে ২,১৭০টি কৃষি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা এবং প্রায় ১৬,০০০ কৃষি বিজ্ঞানী অংশ নেন। অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির বার্তা ৭০০টি জেলার ১.৫ কোটি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি ১.৪৫ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যও নির্ধারিত হয়।
এই অভিযানটি ছয়টি মূল পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ হ্রাস, ন্যায্য দাম নিশ্চিতকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ, ফসল বৈচিত্র্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে উৎসাহ প্রদান এবং প্রাকৃতিক ও জৈব কৃষির প্রসার।
মন্ত্রী নাথ জানান, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ৩টি করে বিশেষজ্ঞ দল গঠিত হয়, যারা প্রতিদিন ৩টি করে কৃষক সভা করেন। এর ফলে প্রতিটি জেলায় গড়ে ১০৮টি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং রাজ্যের ৮টি জেলায় মোট ৯৫৬টি সভা আয়োজিত হয়। এই সভাগুলিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বৈজ্ঞানিক কৃষি, পশুপালন, মৎস্যচাষ, মৃত্তিকা স্বাস্থ্য পরীক্ষা ইত্যাদি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। প্রতিটি সভায় কমপক্ষে ২০০ জন কৃষক, এফপিও, এফপিসি ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য অংশগ্রহণ করেন।
নাথ বলেন, “এই ১৫ দিনে কৃষি আধিকারিক ও বিজ্ঞানীরা রাজ্যজুড়ে কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং তাদের মূল্যবান পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। সেই মতামতের ভিত্তিতে রাজ্যের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “দেশ ইতিমধ্যে সবুজ বিপ্লব, সাদা বিপ্লব ও নীল বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে। বর্তমানে চলছে হলুদ বিপ্লব, এবং শিগগিরই শুরু হবে ‘মিষ্টি বিপ্লব’। মৌচাষের মাধ্যমে মধু উৎপাদনে স্বনির্ভরতা আনতে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়া হবে।”
খরিফ মৌসুম প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “ত্রিপুরায় ২.০১ লক্ষ হেক্টর জমিতে খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়। এই অভিযানের ফলে বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতি হেক্টরে ৫০০ কেজি করে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হলে, এই বছর রাজ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদন ১ লক্ষ মেট্রিক টন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। তবেই এই অভিযানের আসল লক্ষ্য পূরণ হবে।”
এই সফল অভিযানের মাধ্যমে ত্রিপুরা কৃষি উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছে, যেখানে নারী কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
